যেভাবে জীবনকে ক্রমশ সহজ করছে কিউআর কোড

নগদ ও বিকাশের বদৌলতে কিউআর (QR Code) কোড দেখেননি এমন লোক খুঁজে পাওয়া যাবে না। অলিগলির সব দোকানে ক্যাশ আউটের জন্য কিউআর কোড সাঁটানো আছে। কোড স্ক্যান করলেই নিজে নিজে ক্যাশ আউটের সব তথ্য চলে আসে। এখন এমন কোন পণ্য নেই যার পেছনে কোম্পানির কিউ আর কোড নেই। সুপারশপ গুলোতে পণ্যের দামের জন্যও কিউআর কোড ব্যবহার করা হয়। এমন কোন শপিং মল, অফিস আদালত, আন্তর্জাতিক কোম্পানি নেই এখন আর যারা তাদের তথ্য কিউ আর কোডে সংরক্ষণ করে না। এমনকি এখন ওয়াই-ফাই এর পাসওয়ার্ড ও শেয়ার করা যায় কিউআর কোড এর মাধ্যমে।
QR Code এর পূর্ণরুপ হলো Quick Response Code. এটি একধরনের মেশিন রিডেবল কোড বা সাংকেতিক ভাষা যেখানে অল্প কিছু তথ্য সংরক্ষণ করা যায় যা কেবল মাত্র মেশিন পড়তে পারে। এই কোডের বিশেষত্ব হলো দ্রুততা। ওয়েবসাইটের লিংক, ছোট টেক্সট বা বড় অংকের সংখ্যা যে কোন তথ্য এই কোডে জমা থাকলে দ্রুত তা বের করা সম্ভব বলেই এর নাম রাখা হয়েছে কুইক রেস্পন্স কোড।
বার কোডের উন্নত সংস্করণ, এক ধরনের দ্বিমাত্রিক বার কোড হলো কিউআর কোড। যেসব তথ্য ঘন ঘন প্রয়োজন হয় বা অনেক বড় অংকের মানুষকে দিতে হয়, সেসব তথ্য কিউআর কোড হিসেবে তৈরি করে রাখলেই বারবার সেই তথ্য গুলো দেয়া নেয়ার ঝামেলায় যেতে হয় না এবং সময় বেঁচে যায়। যেমন নগদ বা বিকাশের ক্যাশ আউটের সময় এজেন্টকে বারবার এজেন্ট নাম্বার দিতে হত, কিউ আর কোডের মাধ্যমে এজেন্ট নাম্বার এখন সহজেই গ্রাহক পেয়ে যাচ্ছে। এতে গ্রাহক ও এজেন্ট দুজনেরই কষ্ট ও সময় বেঁচে যাবে।
'ডেনসো ওয়েব' নামক জাপানের একটি বিখ্যাত মোটরগাড়ি নির্মাণকারী সংস্থা ১৯৯৪ সালে সর্বপ্রথম এই QR code-এর নকশা নিয়ে আসে। শুরুর দিকে এই কিউ আর কোডগুলো শুধুমাত্র অটোমোটিভ ইন্ডাস্ট্রিতে ব্যবহৃত হলেও পরবর্তীতে সারা বিশ্বের বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রিতে ব্যবহৃত হতে শুরু করে। আর এই কিউআর কোডগুলোর তথ্য সঞ্চয়ের ক্ষমতা অনেক বেশি হওয়ায় এবং স্ক্যানের মাধ্যমে সেগুলোকে সহজেই পাঠ করা যায় বলে অনেক দ্রুত কিউআর কোড জনপ্রিয়তা লাভ করে। তবে বারকোডের এই উন্নততর সংস্করণের চাহিদা বেশি হয়েছে স্মার্টফোনের যুগে। এমনকি ভিজিটিং কার্ডেও কিউআর কোডের মাধ্যমে অনলাইনে শেয়ারেবল ভিজিটিং কার্ড ও সিভি দিয়ে থাকে অনেকেই।
কিউআর কোড মূলত দুই ধরনের হয় - ডায়নামিক এবং স্ট্যাটিক। যে কিউ আর কোডের তথ্য কোড তৈরির পরে আর পরিবর্তন করা যায় না, সেগুলো স্ট্যাটিক কিউ আর কোড। যেমন ক্যাশ আউটের তথ্য, মার্কেটিং এর তথ্য এসব সাধারণত স্ট্যাটিক কিউআর কোড হয়ে থাকে। আবার যেসব কিউআর কোডে জমা থাকা তথ্য পরবর্তীতে পরিবর্তন করা যায়, সেগুলো ডায়নামিক কিউআর কোড। ডায়নামিক কিউ আর কোডে মূলত ওয়েবসাইটের লিংক থাকে, যেখানে গিয়ে ঐ তথ্য দেখতে হয়। যে কারণে সহজেই ওয়েবসাইটে থাকা তথ্য পরবর্তন করা সম্ভব হয়।
কিউআর কোড ব্যবহারের অনেক সুবিধা রয়েছে। যেখানে বারকোডে ১০ থেকে ১২ অংকের সংখ্যার তথ্য মজুদ করা যায়, সেখানে কিউআর কোডে এর থেকে বহুগুণ বেশি তথ্য রাখা যায়। একটি কিউ আর প্রায় ২০০০ ক্যারেক্টার বা অংক সংরক্ষণ করে রাখতে পারে। তবে কিউআর কোডে যত বেশি তথ্য সংরক্ষণ করা হয়, কিউ আর কোডের ঘনত্ব তত বাড়তে থাকে এবং স্ক্যানিং এ সময় বেশি প্রয়োজন হয়।
আবার কিউআর কোড একবার তৈরির পর তাতে সংরক্ষিত তথ্য আর নষ্ট হয় না। যতদিন কিউ আর কোডটি ঠিক থাকবে, ততদিন কিউআর কোডে সংরক্ষিত তথ্য নিরাপদ থাকবে ইমেইল, মেসেজে , প্রিন্ট করে বা ছবি আকারে সহজেই কিউ আর কোড আদান প্রদান করা যায়। ফলে কিউআর কোডের মাধ্যমে সহজেই লিংক, তথ্য পাঠানো যায়।
এখন, প্রশ্ন আসতেই পারে কিউআর কোড ব্যবহারের এত সুবিধা, আমি কিভাবে এই সুবিধা পাব? উত্তর সহজ। গুগল প্লে স্টোরেই আপনি অনেক কিউ আর কোড রিডার এবং কিউআর কোড জ্যানারেটর এপ পেয়ে যাবেন। আবার অনেক অনলাইন ওয়েবসাইট ও এই সুবিধা দিয়ে থাকে। সফটওয়্যার এর সাহায্যে আপনার দেয়া তথ্য অনুযায়ী আপনার জন্য একটি ইউনিক কিউ আর কোড তৈরি করে দেবে ওই এপ বা ওয়েবসাইট।
সময়ের সাথে টেক্কা দিয়ে ডিজিটাল হচ্ছে সব কিছু। মানুষের সময় কমছে। দ্রুত ও সহজেই মানুষ সব কিছু পেতে চায়। মুহুর্তের মধ্যে কোড স্ক্যান করে টাকা ট্রান্সফার কিংবা এক স্ক্যানে যেকোন সেবা, প্রচারণার সব তথ্য নিজের মুঠোফোনে দেখতে পাচ্ছে মানুষ। প্রযুক্তির বদৌলতে সব কিছুই এখন যেন জীবনকে সহজতর করার পন্থা।
Comments
Sign in to join the conversation.
Be the first to comment.